কৃষির সবচেয়ে বড় প্রকল্পে এবার বিতর্কিত কর্মকর্তাকে বসানোর উদ্যোগ

অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত ও বিভাগীয় মামলা হওয়া কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ২ ঘণ্টা আগে |   

কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স’ (পার্টনার) নিয়ে আবারও প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের নতুন পরিচালক হিসেবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি উইংয়ের উপপরিচালক (প্রকল্প বাস্তবায়ন) ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন শরীফের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। তাঁর নাম সুপারিশ করে ডিএই থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এনএটিপি ফেজ-২ প্রকল্পের পরিচালক থাকাকালে সাখাওয়াত হোসেন শরীফের বিরুদ্ধে অডিটের নামে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, ভুয়া অডিটের আয়োজন এবং প্রকল্পের বিভিন্ন কাজে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের তদন্তে ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে ডিএই। তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়।

অন্যদিকে, কৃষি বিভাগের সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পের মাধ্যমে চলতি অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং আগামী ১ অক্টোবর ফেনী থেকে দেশব্যাপী প্রথম ধাপের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের কর্মসূচি রয়েছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির ঠিক আগে প্রকল্পের পরিচালক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ায় প্রকল্পের নেতৃত্ব ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

পার্টনার প্রকল্পটি ২০২৩ সালে শুরু হয়। বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে নেওয়া প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পকে কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় প্রকল্প হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো, কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণ, কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়ানো এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য।

প্রকল্প শুরুর দিকে পিডির দায়িত্বে ছিলেন মো. মিজানুর রহমান। দুই বছরের মাথায় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে সরিয়ে ডিএইর কিশোরগঞ্জের উপপরিচালক আবুল কালাম আজাদকে পিডি করা হয়। এক বছর না যেতেই আবারও পিডি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে

সাখাওয়াত হোসেন শরীফ এর আগে ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম (এনএটিপি) ফেজ-২ প্রকল্পে মনিটরিং অফিসার, উপপ্রকল্প পরিচালক এবং পরে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০২৩ সালের নভেম্বরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এনএটিপি ফেজ-২ প্রকল্পের হিসাব নিরীক্ষার নামে ২৭০ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প পরিচালকের সই করা চিঠির মাধ্যমে ওই কর্মকর্তাদের অডিটের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে খামারবাড়িতে আসতে বলা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, অডিট অধিদপ্তরকে ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়।

বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ডিএই তদন্ত কমিটি গঠন করে। ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্য ছিলেন উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. হযরত আলী, উপপরিচালক (রপ্তানি) ড. মো. মফিজুল ইসলাম এবং উপপরিচালক (ডিপ্লোমা এডুকেশন) মো. মনিরুল ইসলাম।

তদন্ত কমিটির সদস্য ড. মো. হযরত আলী বলেন, সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করে প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। কাগজপত্র সংগ্রহের নামে কর্মকর্তাদের কাছে অর্থ দাবি করা হয়েছিল এবং অডিট ঠিকঠাক সম্পন্ন করতে টাকার প্রয়োজন—এমন কথা বলা হয়েছিল। পরে প্রকৃতপক্ষে কোনো অডিট হয়নি।

এ ছাড়া এনএটিপি ফেজ-২ প্রকল্পে নির্মাণকাজ ছাড়াই ‘ভূতুড়ে পরিমাপ’ বা বিল অব কোয়ানটিটি দেখিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অভ্যন্তরীণ রাস্তা নির্মাণে ৪২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা এবং কারশেড নির্মাণে ১২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। অথচ বাস্তবে এসব কাজের যথেষ্ট অগ্রগতি ছিল না। এসব অভিযোগেরও তদন্ত হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য, কমিটি অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। পরে সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তবে তদন্ত প্রতিবেদন ও বিভাগীয় মামলার পরও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রাখা হয় বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

খামারবাড়ির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, আগের সরকারের সময়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সাখাওয়াত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। তাঁদের দাবি, আওয়ামী লীগের তৎকালীন কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁর পক্ষে সুপারিশ করা হয়েছে।

কয়েকজন কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাখাওয়াত নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন প্রশাসনিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা করেন। এমনকি তাঁকে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টাও হয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেন।


প্রকল্পের টেন্ডার ও বদলি-পদায়ন নিয়েও অভিযোগ

বর্তমানে পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি উইংয়ে দায়িত্ব পালনের সময় সাখাওয়াতকে ঘিরে আরও কিছু অভিযোগ করেছেন ডিএইর কয়েকজন কর্মকর্তা। তাঁদের দাবি, তিনি কয়েকজন প্রকল্প পরিচালক ও উপপরিচালককে নিয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেছেন। ওই বলয়ের মাধ্যমে ডিএইর বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার, বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।

কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায় এবং পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর জন্য এই বলয় কাজ করছে।

একই সূত্রগুলো দাবি করে, বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মকর্তা পদায়নের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। 

ডিএইর কয়েকজন কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, বর্তমান সময়ে অধিদপ্তরের প্রকল্প, টেন্ডার ও বদলি-পদায়নকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রে বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মকর্তা ছাড়াও প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা রয়েছেন।

কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, এই চক্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কিছু কর্মকর্তাকে বর্তমান সময়েও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। সার সংকটসহ কৃষি খাতের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও ওই গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।


মন্তব্য লিখুন :