খামারবাড়িতে চেয়ার দখলের প্রতিযোগিতায় এবার ‘স্বৈরাচারের দোসর’ তকমা

পছন্দের লোক না হলে, কথা না শুনলে, চাঁদা বা অনৈতিক সুবিধা না দিলেই শুরু হয় অপপ্রচার

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ৫ ঘণ্টা আগে |   

রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) গুরুত্বপূর্ণ পদ দখলকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা থামছে না। পছন্দের লোককে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো, বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তার এবং টেন্ডারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে প্রভাবশালী একটি চক্র। তাদের চাহিদামতো না চললে কিংবা অনৈতিক সুবিধা না দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘স্বৈরাচারের দোসর’ তকমা দিয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

সর্বশেষ সোমবার ডিএই’র তিন কর্মকর্তার ছবি দিয়ে পোস্টার লাগানো হয়। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ডিএইর কয়েকজন কর্মচারী পোস্টারগুলো নামাতে গেলে কেআইবি থেকে কৃষিবিদের সংগঠন এগ্রিকালচারিস্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এ্যাব) এক নেতার কয়েকজন অনুসারী তাঁদের ধাওয়া দেন। তবে এর কিছুক্ষণ পর আবার ডিএই’র কর্মচারীরা এসে পোস্টারগুলো ছিড়ে পেলেন। এর আগে গত বুধবারও ডিএইর প্রধান কার্যালয়ের আশপাশের দেয়াল ও পিলারে এসব কর্মকর্তার ছবি দিয়ে পোস্টার সাঁটানো হয়েছিল। এতে তাঁদের ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে কৃষি খাতের স্বার্থে অপসারণের দাবি জানানো হয়। ‘জাতীয়তাবাদী সচেতন কৃষিবিদ সমাজের’ ব্যানারে লাগানো এসব পোস্টারে ছিলেন ডিএইর পরিকল্পনা উইংয়ের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেন, প্রশাসন উইংয়ের উপপরিচালক মুরাদুল হাসান এবং টিস্যু কালচার প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবায়ের মাশরুর।

ডিএইর কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের সরিয়ে বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে এখন নতুন করে আবার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখলে নেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। প্রকল্প পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে নতুন কর্মকর্তা বসাতে কৃষি মন্ত্রণালয়ে চাপ সৃষ্টি করছে একটি চক্র। তদবিরে সফল না হয়ে এখন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পোস্টার লাগানো ও রাজনৈতিক তকমা দেওয়া হচ্ছে।

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কোনো কর্মকর্তা পছন্দের ব্যক্তিকে পদায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে, তদবিরে সাড়া না দিলে কিংবা কোনো অনৈতিক সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বানানোর চেষ্টা করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কিছু সংবাদমাধ্যম এবং দেয়ালে পোস্টার লাগিয়ে সেই প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

গত বুধবার ও গতকাল সোমবার লাগানো পোস্টারে থাকা তিন কর্মকর্তার মধ্যে মুরাদুল হাসান শিক্ষা জীবনে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও ছিলেন। মুরাদুল হাসান বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশাসন উইংয়ের উপপরিচালক পদে আমার পদায়ন হয়েছে। ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। অথচ এখন আমাকে ফ্যাসিস্টের দোসর বলা হচ্ছে। মূলত কৃষি মন্ত্রণালয়ে চাপ সৃষ্টি করে আমার চেয়ার দখল করতে না পেরে একটি চক্র অপপ্রচারে নেমেছে। এই চক্র বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। তাদের কথা মতো না চললে বা অনৈতিক সুবিধা না দিলেই ফ্যাসিস্টের দোসর তকমা দেওয়া হয়।’

পোস্টারে থাকা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা উইংয়ের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেনও ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি পটুয়াখালী কৃষি কলেজে পড়াশোনার সময় ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ক্যাম্পাসের আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের সম্মুখসারিতে ছিলাম। অথচ এখন স্বৈরাচারের দোসর তকমা দেওয়া হচ্ছে। মূলত চেয়ার দখলের জন্যই এসব হচ্ছে।’

অন্যদিকে, পোস্টারে থাকা টিস্যু কালচার প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবায়ের মাশরুরের ছাত্ররাজনীতিতে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁকে ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন বলে প্রচার করা হচ্ছে। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন, সেখানে কোনো রাজনীতি নেই। প্রায় দেড় দশক ধরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত তালহা জুবায়ের মাশরুর কৃষি প্রযুক্তি, তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা, টিস্যু কালচার, মিনি কোল্ডস্টোরেজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি উদ্যোগ নিয়ে কাজ করেছেন। কৃষিতে তাঁর কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক 'কর্নেল অ্যালায়েন্স ফর সায়েন্স' বিশ্বজুড়ে কৃষিতে পরিবর্তন আনা পাঁচ তরুণকে নিয়ে একটি তালিকা প্রকাশ করে। ভারত, ঘানা, কেনিয়া ও জিম্বাবুয়ের চার তরুণের সঙ্গে ওই তালিকায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি ছিলেন তালহা জুবায়ের মাশরুর। ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে কাজ করা এই আন্তর্জাতিক সংগঠনের 'বৈশ্বিক নেতৃত্ব ফেলোশিপ' কর্মসূচিতেও অংশ নেন তিনি।

নিজের কাজের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালে খুলনা বিভাগের সব শাখার কর্মকর্তাদের মধ্যে তালহা জুবায়ের মাশরুর ‘সেরা উদ্ভাবনী কর্মকর্তা’ সম্মাননা পান। কৃষিতে অবদানের জন্য তিনি 'জাতীয় কৃষি পুরস্কারের স্বর্ণপদক', 'প্রথম আলো স্বেচ্ছাসেবী সেবা পুরস্কার' এবং ২০২৪ সালে 'প্রথম আলো–সিটিগ্রুপ কৃষি পুরস্কারও' পেয়েছেন।

তালহা জুবায়ের মাশরুর বলেন, ‘কে কোন দায়িত্বে থাকবেন, সেটি সরকারের সিদ্ধান্ত। কোনো পদ আঁকড়ে থাকার মানসিকতা আমার নেই। তবে কাউকে দায়িত্ব থেকে সরানোর জন্য স্বৈরাচারের দোসর তকমা দেওয়া দুঃখজনক।’

ডিএইর কর্মকর্তাদের অভিযোগ, শুধু বদলি-পদায়ন নয়, বিভিন্ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন নিয়েও একটি পক্ষ তৎপর। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এরই মধ্যে ১২ জন প্রকল্প পরিচালককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার নতুন করে গত মাসে ১১ জন প্রকল্প পরিচালককে বদলির একটি তালিকা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কৃষিমন্ত্রী সেই ফাইল আটকে দেন। চাপ সৃষ্টি করে পদ থেকে সরাতে না পেরে তাঁদের স্বৈরাচারের দোসর বলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ থাকলে অধিদপ্তরের ডিজির কাছে অভিযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক তকমা দিয়ে পোস্টারিং করে একজন কর্মকর্তাকে অপমান করা ঠিক না। এটা অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। একজন কর্মকর্তাকে  কাজ, দক্ষতা ও প্রশাসনিক যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা না গেলে কৃষি খাতে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। 

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন, কে বা কারা পোস্টার লাগিয়েছেন, তা এখনো শনাক্ত করা যায়নি। যাঁরা এ কাজ করেছেন, তাঁরা মোটেই ঠিক করেননি। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এভাবে কর্মকর্তাদের ছবি দিয়ে পোস্টার লাগানো খুব ন্যাক্কারজনক কাজ। এ বিষয়ে অধিদপ্তরেরর পক্ষ থেকে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, পোস্টার লাগানো হয়েছে ডিএই’র বাইরে। এ ছাড়া কারা এই পোস্টার লাগিয়েছে তাও আমরা জানি না। যাদের ছবি দিয়ে পোস্টার লাগানো হয়েছে তারা মানহানি মামলা করতে পারে।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বদলি কিংবা পদায়ন নিয়ম মেনেই হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। চাপ সৃষ্টি করে কিছু করার সুযোগ নেই।


মন্তব্য লিখুন :